শনিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৫

বইপড়া - প্রমথ চৌধুরী

বই পড়া শখটা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ শখ হলেও আমি কাউকে শখ হিসেবে বই পড়তে পরামর্শ দিতে চাইনে।
প্রম, সে পরামর্শ কেউ গ্রাহ্য করবেন না; কেননা, আমরা জাত হিসেবে শৌখিন নই। দ্বিতীয়ত, অনেকে তা
কুপরামর্শ মনে করবেন; কেননা, আমাদের এখন ঠিক শখ করবার সময় নয়। আমাদের এই রোগ-শোক,
দুঃখ-দারিদ্র্যের দেশে সুন্দর জীবন ধারণ করাই যখন হয়েছে প্রধান সমস্যা, তখন সেই জীবনকেই সুন্দর
করা, মহৎ করার প্রস্তাব অনেকের কাছে নিরর্থক এবং নির্মমও ঠেকবে। আমরা সাহিত্যের রস উপভোগ
করতে প্রস্তুত নই; কিন্তু শিক্ষার ফল লাভের জন্য আমরা সকলে উদ্বাহু। আমাদের বিশ্বাস শিক্ষা আমাদের
গায়ের জ্বালা ও চোখের জল দুই-ই দূর করবে। এ আশা সম্ভবত দুরাশা; কিন্তু তা হলেও আমরা তা ত্যাগ
করতে পারি নে। কেননা, আমাদের উদ্ধারের জন্য কোনো সদুপায় আমরা চোখের সুমুখে দেখতে পাইনে।
শিক্ষার মাহাত্ম্যে আমিও বিশ্বাস করি এবং যিনিই যাই বলুন সাহিত্যচর্চা যে শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ সে বিষয়ে
কোনো সন্দেহ নেই। লোকে যে তা সন্দেহ করে, তার কারণ এ শিক্ষার ফল হাতে হাতে পাওয়া যায় না,
অর্থাৎ তার কোনো নগদ বাজার দর নেই। এই কারণে ডেমোক্রেসি সাহিত্যের সার্থকতা বোঝে না, বোঝে
শুধু অর্থের সার্থকতা। ডেমোক্রেসির গুরুরা চেয়েছিলেন সকলকে সমান করতে কিন্তু তাদের শিষ্যরা তাদের
কথা উল্টো বুঝে সকলেই হতে চায় বড় মানুষ। একটি বিশিষ্ট অভিজাত সভ্যতার উত্তরাধিকারী হয়েও
ইংরেজি সভ্যতার সংস্পর্শে এসে আমরা ডেমোক্রেসির গুণগুলো আয়ত্ত করতে না পেরে তার দোষগুলো
আত্মসাৎ করেছি। এর কারণও স্পষ্ট। ব্যাধিই সংক্রামক স্বাস্থ্য নয়। আমাদের শিক্ষিত সমাজের লোলুপদৃষ্টি
আজ অর্থের ওপরই পড়ে রয়েছে। সুতরাং সাহিত্যচর্চার সুফল সম্বন্ধে অনেকেই সন্দিহান। যাঁরা হাজারখানা
ল-রিপোর্ট কেনেন, তারা একখানা কাব্রগ্রন্থও কিনতে প্রস্তুত নন, কেননা, তাতে ব্যবসার কোনো সুসার নেই।
নজির না আউড়ে কবিতা আবৃত্তি করলে মামলা যে হারতে হবে সে তো জানা কথা, কিন্তু যে কথা জজে
শোনে না, তার যে কোনো মূল্য নেই, এইটেই হচ্ছে পেশাদারদের মহাভ্রান্তি। জ্ঞানের ভান্ডার যে ধনের
ভান্ডার নয় এ সত্য তো প্রত্যক্ষ। কিন্তু সমান প্রত্যক্ষ না হলেও সমান সত্য যে, এ যুগে যে জাতির জ্ঞানের
ভাণ্ডার শূন্য সে জাতির ধনের ভাঁড়েও ভবানী। তারপর যে জাতি মনে বড় নয়, সে জাতি জ্ঞানেও বড় নয়;
কেননা ধনের সৃষ্টি যেমন জ্ঞান সাপেক্ষ তেমনি জ্ঞানের সৃষ্টি মন সাপেক্ষ এবং মানুষের মনকে সরল, সচল,
সরাগ ও সমৃদ্ধ করার ভার আজকের দিনে সাহিত্যের ওপরও ন্যস্ত হয়েছে। কেননা, মানুষের দর্শন, বিজ্ঞান,
ধর্মনীতি, অনুরাগ-বিরাগ, আশা-নৈরাশ্য, তার অন্তরের সত্য ও স্বপড়ব এই সকলের সমবায়ে সাহিত্যের জন্ম।
অপরাপর শাস্ত্রের ভিতর যা আছে সেসব হচ্ছে মানুষের মনের ভগড়বাংশ; তার পুরো মনটার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়
শুধু সাহিত্যে। দর্শন বিজ্ঞান ইত্যাদি হচ্ছে তার মনগঙ্গার তোলা জল, তার পূর্ণ স্রোত আবহমানকাল
সাহিত্যের ভেতরই সোল−বাতাসে সবেগে বয়ে চলেছে এবং সেই গঙ্গাতে অবগাহন করেই আমরা আমাদের সকল
পাপমুক্ত হব।
অতএব, দাঁড়াল এই যে, আমাদের বই পড়তে হবে, কেননা বই পড়া ছাড়া সাহিত্যচর্চার উপায়ান্তর নেই। ধর্মের
চর্চা চাই কি মন্দিরের বাইরেও করা চলে, দর্শনের চর্চা গুহায়, নীতির চর্চা ঘরে এবং বিজ্ঞানের চর্চা জাদুঘর; কিন্তু
সাহিত্যের চর্চার জন্য চাই লাইব্রেরি; ও-চর্চা মানুষে কারখানাতেও করতে পারে না; চিড়িয়াখানাতেও নয়। এইসব
কথা যদি সত্য হয়, তাহলে আমাদের মানতেই হবে যে, সাহিত্যের মধ্যে আমাদের জাত মানুষ হবে। সেইজন্য
আমরা যত বেশি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করব, দেশের তত বেশি উপকার হবে।
আমাদের মনে হয় এ দেশে লাইব্রেরির সার্থকতা হাসপাতালের চাইতে কিছু কম নয় এবং স্কুল- কলেজের
চাইতে একটু বেশি। একথা শুনে অনেকে চমকে উঠবেন। কেউ কেউ আবার হেসেও উঠবেন; কিন্তু আমি
জানি, আমি রসিকতাও করছিনে, অদ্ভুত কথাও বলছিনে; যদিও এ বিষয়ে লোকমত যে আমার মতের
সমরেখায় চলে না, সে বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ সচেতন। অতএব আমার কথার আমি কৈফিয়ত দিতে বাধ্য।
আমার বক্তব্য আমি আপনাদের কাছে নিবেদন করছি তার সত্য মিথ্যার বিচার আপনারা করবেন। সে বিচারে
আমার কথা যদি না টেকে তাহলে রসিকতা হিসেবেই গ্রাহ্য করবেন।
আমার বিশ্বাস শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে না। সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত। আজকের বাজারে
বিদ্যাদাতার অভাব নেই। এমন কি, এ ক্ষেত্রে দাতাকর্ণেরও অভাব নেই; এবং আমরা আমাদের ছেলেদের
তাদের দ্বারস্থ করেই নিশ্চিত থাকি এই বিশ্বাসে যে, সেখানে থেকে তারা এতটা বিদ্যার ধন লাভ করে ফিরে
আসবে যার সুদে তার বাকি জীবন আরামে কাটিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু এ বিশ্বাস নিতান্ত অমূলক।
মনোরাজ্যের দান গ্রহণসাপেক্ষ, অথচ আমরা দাতার মুখ চেয়ে গ্রহীতার কথাটা একেবারেই ভুলে যাই। এ
সত্য ভুলে না গেলে আমরা বুঝতাম যে, শিক্ষকের সার্থকতা শিক্ষাদান করায় নয়, কিন্তু ছাত্রকে তা অর্জন
করতে সক্ষম করায়। শিক্ষক ছাত্রকে শিক্ষার পথ দেখিয়ে দিতে পারেন, তার কৌতূহল উদ্রেক করতে
পারেন, তার বুদ্ধিবৃত্তিকে জাগ্রত করতে পারেন, মনোরাজ্যের ঐশ্বর্যের সন্ধান দিতে পারেন, তার জ্ঞান
পিপাসাকে জ্বলন্ত করতে পারেন, এর বেশি আর কিছু পারেন না। যিনি যথার্থ গুরু তিনি শিষ্যের আত্মাকে
উদ্বোধিত করেন এবং তার অন্তর্নিহিত সকল প্রচ্ছনড়ব শক্তিকে ব্যক্ত করে তোলেন। সেই শক্তির বলে শিষ্য
নিজের মন নিজে গড়ে তোলে, নিজের অভিমত বিদ্যা নিজে অর্জন করে বিদ্যার সাধনা শিষ্যকে নিজে অর্জন
করতে হয়। গুরু উত্তরসাধক মাত্র।
আমাদের স্কুল কলেজের শিক্ষার পদ্ধতি ঠিক উলটো। সেখানে ছেলেদের বিদ্যে গেলানো হয়, তারা তা জীর্ণ
করতে পারুক আর নাই পারুক। এর ফলে ছেলেরা শারীরিক ও মানসিক মন্দাগিড়বতে জীর্ণশীর্ণ হয়ে কলেজ
থেকে বেরিয়ে আসে। একটা জানাশোনা উদাহরণের সাহায্যে ব্যাপারটা পরিষ্কার করা যাক। আমাদের
সমাজে এমন অনেক মা আছেন যাঁরা শিশু সন্তানকে ক্রমান্বয়ে গরুর দুধ গেলানোটাই শিশুর স্বাস্থ্যরক্ষার ও
বলবৃদ্ধির সর্বপ্রধান উপায় মনে করেন। দুগ্ধ অবশ্য অতিশয় উপাদেয় পদার্থ, কিন্তু তার উপকারিতা যে
ভোক্তার জীর্ণ করবার শক্তির ওপর নির্ভর করে এ জ্ঞান ও শ্রেণির মাতৃকুলের নেই। তাদের বিশ্বাস ও-বস্তু
পেটে গেলেই উপকার হবে। কাজেই শিশু যদি তা গিলতে আপত্তি করে তাহলে সে যে বেয়াড়া ছেলে, সে
বিষয়ে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না। অতএব তখন তাকে ধরে বেঁধে জোর জবরদস্তি করে দুধ খাওয়ানোর
ব্যবস্থা করা হয়। শেষটায় সে যখন এই দুগ্ধপান ক্রিয়া হতে অব্যাহতি লাভ করার জন্য মাথা নাড়াতে, হাতপা
ছুড়তে শুরু করে, তখন সেড়বহময়ী মাতা বলেন, আমার মাথা খাও, মরামুখ দেখ, এই ঢোক, আর এক
ঢোক, আর এক ঢোক ইত্যাদি। মাতার উদ্দেশ্য যে খুব সাধু, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু এ
বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে, উক্ত বলা কওয়ার ফলে মা শুধু ছেলের যকৃতের মাথা খান এবং ঢোকের
পর ঢোকে তার মরামুখ দেখবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে চলেন। আমাদের স্কুল কলেজের শিক্ষা পদ্ধতিটাও ঐ
একই ধরনের। এর ফলে কত ছেলের সুস্থ সরল মন যে ইনফ্যান্টাইল লিভারে গতাসু হচ্ছে তা বলা কঠিন।
কেননা দেহের মৃত্যুর রেজিস্টারি রাখা হয়, আত্মার হয় না।
আমরা কিন্তু এই আত্মার অপমৃত্যুতে ভীত হওয়া দূরে থাক, উৎফুল− হয়ে উঠি। আমরা ভাবি দেশে যত ছেলে
পাশ হচ্ছে তত শিক্ষার বিস্তার হচ্ছে। পাশ করা ও শিক্ষিত হওয়া এক বস্তু নয়, এ সত্য স্বীকার করতে
আমরা কুণ্ঠিত হই। শিক্ষা শাস্ত্রের একজন জগদ্বিখ্যাত ফরাসি শাস্ত্রী বলেছেন যে, এক সময়ে ফরাসি দেশে
শিক্ষা পদ্ধতি এতই বেয়াড়া ছিল যে, সে যুগে France was saved by her idlers ;
অর্থাৎ যারা পাশ
করতে পারেনি বা চায়নি তারাই ফ্রান্সকে রক্ষা করেছে। এর কারণ, হয় তাদের মনের বল ছিল বলে
কলেজের শিক্ষাকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল, নয় সে শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করে ছিল বলেই তাদের মনের বল
বজায় ছিল। তাই এই স্কুল-পালানো ছেলেদের দল থেকে সে যুগের ফ্রান্সের যত কৃতকর্মা লোকের আবির্ভাব
হয়েছিল।
সে যুগে ফ্রান্সে কী রকম শিক্ষা দেওয়া হতো তা আমার জানা নেই। তবুও আমি জোর করে বলতে পারি যে,
এ যুগে আমাদের স্কুল কলেজে শিক্ষার যে রীতি চলছে, তার চাইতে সে শিক্ষাপদ্ধতি কিছুতেই নিকৃষ্ট ছিল
না। সকলেই জানেন যে, বিদ্যালয়ে মাস্টার মহাশয়েরা নোট দেন এবং সেই নোট মুখস্থ করে তারা হয়
পাশ। এর জুি ড় আর একটি ব্যাপারও আমাদের দেশে দেখা যায়। এদেশে একদল বাজিকর আছে, যারা
বন্দুকের গুলি থেকে আরম্ভ করে উত্তরোত্তর কামানের গুলি পর্যন্ত গলাধঃকরণ করে। তারপর একে একে
সবগুলো উগলে দেয়। এর ভেতর যে অসাধারণ কৌশল আছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই
গেলা আর ওগলানো দর্শকের কাছে তামাশা হলেও বাজিকরের কাছে তা প্রাণান্তকর ব্যাপার। ও কারদানি
করা তার পক্ষে যেমন কষ্টসাধ্য, তেমনি অপকারী। বলা বাহুল্য, সে বেচারাও লোহার গোলাগুলোর এক
কণাও জীর্ণ করতে পারে না। আমাদের ছেলেরাও তেমনি নোট নামক গুরুদত্ত নানা আকারের ও নানা
প্রকারের গোলাগুলো বিদ্যালয়ে গলাধঃকরণ করে পরীক্ষালয়ে তা উদ্‌গীরণ করে দেয়। এ জন্য সমাজ বাহবা
দেয় দিক, কিন্তু মনে যেন না ভাবে যে, এ জাতির প্রাণশক্তি বাড়ছে। স্কুল কলেজের শিক্ষা যে অনেকাংশে
ব্যর্থ হয়, অনেক স্থলে মারাত্মক। কেননা আমাদের স্কুল কলেজের ছেলেদের স্বশিক্ষিত হবার সে সুযোগ দেয়
না, শুধু তাই নয়, স্বশিক্ষিত হবার শক্তি পর্যন্ত নষ্ট করে। আমাদের শিক্ষাযন্ত্রের মধ্যে যে যুবক নিষ্পেষিত
হয়ে বেরিয়ে আসে, তার আপনার বলতে বেশি কিছু থাকে না, যদি না তার প্রাণ অত্যন্ত কড়া হয়।
সৌভাগ্যের বিষয, এই ক্ষীণপ্রাণ জাতির মধ্যেও জনকতক এমন কঠিন প্রাণের লোক আছে, এহেন
শিক্ষাপদ্ধতিও তাদের মনকে জখম করলেও একেবারে বধ করতে পারে না।
আমি লাইব্রেরিকে স্কুল কলেজের ওপরে স্থান দিই এই কারণে যে, এ স্থলে লোকে স্বেচ্ছায় স্বচ্ছন্দচিত্তে
স্বশিক্ষিত হবার সুযোগ পায়; প্রতিটি লোক তার স্বীয় শক্তি ও রুচি অনুসারে নিজের মনকে নিজের চেষ্টায়
আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। স্কুল কলেজ বর্তমানে আমাদের যে অপকার করছে
সে অপকারের প্রতিকারের জন্য শুধু নগরে নগরে নয়, গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা করা কর্তব্য। আমি
পূর্বে বলেছি যে, লাইব্রেরি হাসপাতালের চাইতে কম উপকারী নয়, তার কারণ আমাদের শিক্ষার বর্তমান
অবস্থায় লাইব্রেরি হচ্ছে একরকম মনের হাসপাতাল। অতঃপর আপনারা জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে, বই
পড়ার পক্ষ নিয়ে এ ওকালতি করবার, বিশেষত প্রাচীন নজির দেখাবার কী প্রয়োজন ছিল? বই পড়া যে
ভালো, তা কে না মানে? আমার উত্তর সকলে মুখে মানলেও কাজে মানে না। মুসলমান ধর্মে মানবজাতি দুই
ভাগে বিভক্ত। যারা কেতাবি, আর এক যারা তা নয়। বাংলায় শিক্ষিত সমাজ যে পূর্বদলভুক্ত নয়, একথা
নির্ভয়ে বলা যায় না; আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায় মোটের ওপর বাধ্য না হলে বই স্পর্শ করেন না। ছেলেরা
যে নোট পড়ে এবং ছেলের বাপেরা যে নজির পড়েন, দুই-ই বাধ্য হয়ে, অর্থাৎ পেটের দায়ে। সেইজন্য
সাহিত্যচর্চা দেশে একরকম নেই বললেই হয়; কেননা, সাহিত্য সাক্ষাৎভাবে উদরপূর্তির কাজে লাগে না।
বাধ্য হয়ে বই পড়ায় আমরা এতটা অভ্যস্ত হয়েছি যে, কেউ স্বেচ্ছায় বই পড়লে আমরা তাকে নিষ্কর্মার দলেই
ফেলে দিই; অথচ একথা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না, যে জিনিস স্বেচ্ছায় না করা যায়, তাতে মানুষের
মনের সন্তোষ নেই। একমাত্র উদরপূর্তিতে মানুষের সম্পূর্ণ মনস্তুষ্টি হয় না। একথা আমরা সকলেই জানি যে,
উদরের দাবি রক্ষা না করলে মানুষের দেহ বাঁচে না; কিন্তু একথা আমরা সকলেই মানিনে যে, মনের দাবি
রক্ষা না করলে মানুষের আত্মা বাঁচে না। দেহরক্ষা অবশ্য সকলেরই কর্তব্য কিন্তু আত্মরক্ষাও অকর্তব্য নয়।
মানবের ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা রয়েছে যে মানুষের প্রাণ মনের সম্পর্ক যত হারায় ততই তা দুর্বল
হয়ে পড়ে। মনকে সজাগ ও সবল রাখতে না পারলে জাতির প্রাণ যথার্থ স্ফুর্তিলাভ করে না; তারপর যে
জাতি যত নিরানন্দ সে জাতি তত নির্জীব। একমাত্র আনন্দের স্পর্শেই মানুষের মনপ্রাণ সজীব, সতেজ ও
সরাগ হয়ে ওঠে। সুতরাং সাহিত্যচর্চার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, জাতির জীবনীশক্তির হ্রাস
করা। অতএব, কোনো নীতির অনুসারেই তা কর্তব্য হতে পারে না। অর্থনীতিরও নয়, ধর্মনীতির নয়।
কাব্যামৃতে যে আমাদের অরুচি ধরেছে সে অবশ্য আমাদের দোষ নয়, আমাদের শিক্ষার দোষ। যার আনন্দ
নেই সে নির্জীব একথা যেমন সত্য, যে নির্জীব তারও আনন্দ নেই, সে কথাও তেমনি সত্য। আমাদের
শিক্ষাই আমাদের নির্জীব করেছে। জাতির আত্মরক্ষার জন্য এ শিক্ষার উলটো টান যে আমাদের টানতে হবে,
এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ। এই বিশ্বাসের বলেই আমি স্বেচ্ছায় সাহিত্যচর্চার সপক্ষে এত বাক্য ব্যয় করলুম।
সে বাক্যে আপনাদের মনোরঞ্জন করতে সক্ষম হয়েছি কিনা জানিনে। সম্ভবত হইনি। কেননা, আমাদের
দুরবস্থার কথা যখন স্মরণ করি, তখন খালি কোমল সুরে আলাপ করা আর চলে না; মনের আক্ষেপ প্রকাশ
করতে মাঝে মাঝেই কড়ি লাগাতে হয়।

কাবুলিওয়ালা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমার পাঁচ বছর বয়সের ছোটো মেয়ে মিনি এক দণ্ড কথা না কহিয়া থাকিতে পারে না । পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া ভাষা শিক্ষা করিতে সে কেবল একটি বৎসর কাল ব্যয় করিয়াছিল , তাহার পর হইতে যতক্ষণ সে জাগিয়া থাকে এক মুহূর্ত মৌনভাবে নষ্ট করে না । তাহার মা অনেকসময় ধমক দিয়া তাহার মুখ বন্ধ করিয়া দেয় , কিন্তু আমি তাহা পারি না । মিনি চুপ করিয়া থাকিলে এমনি অস্বাভাবিক দেখিতে হয় যে , সে আমার বেশিক্ষণ সহ্য হয় না । এইজন্য আমার সঙ্গে তাহার কথোপকথনটা কিছু উৎসাহের সহিত চলে ।

সকালবেলায় আমার নভেলের সপ্তদশ পরিচ্ছেদে হাত দিয়াছি এমন সময় মিনি আসিয়াই আরম্ভ করিয়া দিল , “ বাবা , রামদয়াল দরোয়ান কাককে কৌয়া বলছিল , সে কিচ্ছু জানে না । না ? ”

আমি পৃথিবীতে ভাষার বিভিন্নতা সম্বন্ধে তাহাকে জ্ঞানদান করিতে প্রবৃত্ত হইবার পূর্বেই সে দ্বিতীয় প্রসঙ্গে উপনীত হইল । “ দেখো বাবা , ভোলা বলছিল আকাশে হাতি শুঁড় দিয়ে জল ফেলে , তাই বৃষ্টি হয় । মা গো , ভোলা এত মিছিমিছি বকতে পারে! কেবলই বকে , দিনরাত বকে । ”

এ সম্বন্ধে আমার মতামতের জন্য কিছুমাত্র অপেক্ষা না করিয়া হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিয়া বসিল , “ বাবা , মা তোমার কে হয় । ”

মনে মনে কহিলাম শ্যালিকা ; মুখে কহিলাম , “ মিনি , তুই ভোলার সঙ্গে খেলা কর্‌গে যা । আমার এখন কাজ আছে । ”

সে তখন আমার লিখিবার টেবিলের পার্শ্বে আমার পায়ের কাছে বসিয়া নিজের দুই হাঁটু এবং হাত লইয়া অতিদ্রুত উচ্চারণে 'আগডুম-বাগডুম' খেলিতে আরম্ভ করিয়া দিল । আমার সপ্তদশ পরিচ্ছেদে প্রতাপসিংহ তখন কাঞ্চনমালাকে লইয়া অন্ধকার রাত্রে কারাগারের উচ্চ বাতায়ন হইতে নিম্নবর্তী নদীর জলে ঝাঁপ দিয়া পড়িতেছেন ।

আমার ঘর পথের ধারে । হঠাৎ মিনি আগডুম-বাগডুম খেলা রাখিয়া জানালার ধারে ছুটিয়া গেল এবং চীৎকার করিয়া ডাকিতে লাগিল , “ কাবুলিওয়ালা , ও কাবুলিওয়ালা । ”

ময়লা ঢিলা কাপড় পরা , পাগড়ি মাথায় , ঝুলি ঘাড়ে , হাতে গোটাদুই-চার আঙুরের বাক্স , এক লম্বা কাবুলিওয়ালা মৃদুমন্দ গমনে পথ দিয়া যাইতেছিল — তাহাকে দেখিয়া আমার কন্যারত্নের কিরূপ ভাবোদয় হইল বলা শক্ত , তাহাকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ডাকাডাকি আরম্ভ করিয়া দিল । আমি ভাবিলাম , এখনই ঝুলিঘাড়ে একটা আপদ আসিয়া উপস্থিত হইবে , আমার সপ্তদশ পরিচ্ছেদ আর শেষ হইবে না ।

কিন্তু, মিনির চীৎকারে যেমনি কাবুলিওয়ালা হাসিয়া মুখ ফিরাইল এবং আমাদের বাড়ির দিকে আসিতে লাগিল , অমনি সে ঊর্ধ্বশ্বাসে অন্তঃপুরে দৌড় দিল , তাহার আর চিহ্ন দেখিতে পাওয়া গেল না । তাহার মনের মধ্যে একটা অন্ধ বিশ্বাসের মতো ছিল যে , ঐ ঝুলিটার ভিতর সন্ধান করিলে তাহার মতো দুটো-চারটে জীবিত মানবসন্তান পাওয়া যাইতে পারে ।

এদিকে কাবুলিওয়ালা আসিয়া সহাস্যে আমাকে সেলাম করিয়া দাঁড়াইল — আমি ভাবিলাম , যদিচ প্রতাপসিংহ এবং কাঞ্চনমালার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন তথাপি লোকটাকে ঘরে ডাকিয়া আনিয়া তাহার কাছ হইতে কিছু না কেনাটা ভালো হয় না।

কিছু কেনা গেল। তাহার পর পাঁচটা কথা আসিয়া পড়িল। আবদর রহমান, রুস, ইংরাজ প্রভৃতিকে লইয়া সীমান্তরক্ষানীতি সম্বন্ধে গল্প চলিতে লাগিল।

অবশেষে উঠিয়া যাইবার সময় সে জিজ্ঞাসা করিল , “ বাবু , তোমার লড়কী কোথায় গেল । ”

আমি মিনির অমূলক ভয় ভাঙাইয়া দিবার অভিপ্রায়ে তাহাকে অন্তঃপুর হইতে ডাকাইয়া আনিলাম — সে আমার গা ঘেঁষিয়া কাবুলির মুখ এবং ঝুলির দিকে সন্দিগ্ধ নেত্রক্ষেপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল । কাবুলি ঝুলির মধ্য হইতে কিসমিস খোবানি বাহির করিয়া তাহাকে দিতে গেল , সে কিছুতেই লইল না , দ্বিগুণ সন্দেহের সহিত আমার হাঁটুর কাছে সংলগ্ন হইয়া রহিল । প্রথম পরিচয়টা এমনি ভাবে গেল ।

কিছুদিন পরে একদিন সকালবেলায় আবশ্যকবশত বাড়ি হইতে বাহির হইবার সময় দেখি , আমার দুহিতাটি দ্বারের সমীপস্থ বেঞ্চির উপর বসিয়া অনর্গল কথা কহিয়া যাইতেছে এবং কাবুলিওয়ালা তাহার পদতলে বসিয়া সহাস্যমুখে শুনিতেছে এবং মধ্যে মধ্যে প্রসঙ্গক্রমে নিজের মতামতও দো-আঁসলা বাংলায় ব্যক্ত করিতেছে । মিনির পঞ্চবর্ষীয় জীবনের অভিজ্ঞতায় বাবা ছাড়া এমন ধৈর্যবান শ্রোতা সে কখনো পায় নাই । আবার দেখি , তাহার ক্ষুদ্র আঁচল বাদাম-কিসমিসে পরিপূর্ণ । আমি কাবুলিওয়ালাকে কহিলাম , “ উহাকে এ-সব কেন দিয়াছ । অমন আর দিয়ো না । ” বলিয়া পকেট হইতে একটা আধুলি লইয়া তাহাকে দিলাম । সে অসংকোচে আধুলি গ্রহণ করিয়া ঝুলিতে পুরিল ।

বাড়িতে ফিরিয়া আসিয়া দেখি , সেই আধুলিটি লইয়া ষোলো-আনা গোলযোগ বাধিয়া গেছে ।

মিনির মা একটা শ্বেত চকচকে গোলাকার পদার্থ লইয়া ভর্ৎসনার স্বরে মিনিকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন , “ তুই এ আধুলি কোথায় পেলি । ”

মিনি বলিতেছে , “ কাবুলিওয়ালা দিয়েছে । ”

তাহার মা বলিতেছেন , “ কাবুলিওয়ালার কাছ হইতে আধুলি তুই কেন নিতে গেলি । ”

মিনি ক্রন্দনের উপক্রম করিয়া কহিল , “ আমি চাই নি , সে আপনি দিলে । ”

আমি আসিয়া মিনিকে তাহার আসন্ন বিপদ হইতে উদ্ধার করিয়া বাহিরে লইয়া গেলাম ।

সংবাদ পাইলাম , কাবুলিওয়ালার সহিত মিনির এই যে দ্বিতীয় সাক্ষাৎ তাহা নহে , ইতিমধ্যে সে প্রায় প্রত্যহ আসিয়া পেস্তাবাদাম ঘুষ দিয়া মিনির ক্ষুদ্র লুব্ধ হৃদয়টুকু অনেকটা অধিকার করিয়া লইয়াছে ।

দেখিলাম , এই দুটি বন্ধুর মধ্যে গুটিকতক বাঁধা কথা এবং ঠাট্টা প্রচলিত আছে — যথা রহমতকে দেখিবামাত্র আমার কন্যা হাসিতে হাসিতে জিজ্ঞাসা করিত , “ কাবুলিওয়ালা , ও কাবুলিওয়ালা , তোমার ও ঝুলির ভিতর কী । ”

রহমত একটা অনাবশ্যক চন্দ্রবিন্দু যোগ করিয়া হাসিতে হাসিতে উত্তর করিত , “ হাঁতি । ”

অর্থাৎ, তাহার ঝুলির ভিতরে যে একটা হস্তী আছে এইটেই তাহার পরিহাসের সূক্ষ্ম মর্ম । খুব যে বেশি সূক্ষ্ম তাহা বলা যায় না , তথাপি এই পরিহাসে উভয়েই বেশ একটু কৌতুক অনুভব করিত — এবং শরৎকালের প্রভাতে একটি বয়স্ক এবং একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর সরল হাস্য দেখিয়া আমারও বেশ লাগিত ।

উহাদের মধ্যে আরো-একটা কথা প্রচলিত ছিল । রহমত মিনিকে বলিত , “ খোঁখী , তোমি সসুরবাড়ি কখুনু যাবে না! ”

বাঙালির ঘরের মেয়ে আজন্মকাল ‘ শ্বশুরবাড়ি ' শব্দটার সহিত পরিচিত , কিন্তু আমরা কিছু একেলে ধরনের লোক হওয়াতে শিশু মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি সম্বন্ধে সজ্ঞান করিয়া তোলা হয় নাই । এইজন্য রহমতের অনুরোধটা সে পরিষ্কার বুঝিতে পারিত না অথচ কথাটার একটা কোনো জবাব না দিয়া চুপ করিয়া থাকা নিতান্ত তাহার স্বভাববিরুদ্ধ , সে উলটিয়া জিজ্ঞাসা করিত , “ তুমি শ্বশুরবাড়ি যাবে ? ”

রহমত কাল্পনিক শ্বশুরের প্রতি প্রকাণ্ড মোটা মুষ্টি আস্ফালন করিয়া বলিত , “ হামি সসুরকে মারবে । ”

শুনিয়া মিনি শ্বশুর নামক কোনো-এক অপরিচিত জীবের দুরবস্থা কল্পনা করিয়া অত্যন্ত হাসিত ।



এখন শুভ্র শরৎকাল । প্রাচীনকালে এই সময়েই রাজারা দিগ্‌বিজয়ে বাহির হইতেন । আমি কলিকাতা ছাড়িয়া কখনো কোথাও যাই নাই , কিন্তু সেইজন্যই আমার মনটা পৃথিবীময় ঘুরিয়া বেড়ায় । আমি যেন আমার ঘরের কোণে চিরপ্রবাসী , বাহিরের পৃথিবীর জন্য আমার সর্বদা মন কেমন করে । একটা বিদেশের নাম শুনিলেই অমনি আমার চিত্ত ছুটিয়া যায় , তেমনি বিদেশী লোক দেখিলেই অমনি নদী পর্বত অরণ্যের মধ্যে একটা কুটিরের দৃশ্য মনে উদয় হয় , এবং একটা উল্লাসপূর্ণ স্বাধীন জীবনযাত্রার কথা কল্পনায় জাগিয়া উঠে ।

এ দিকে আবার আমি এমনি উদ্ভিজ্জপ্রকৃতি যে , আমার কোণটুকু ছাড়িয়া একবার বাহির হইতে গেলে মাথায় বজ্রাঘাত হয় । এইজন্য সকালবেলায় আমার ছোটো ঘরে টেবিলের সামনে বসিয়া এই কাবুলির সঙ্গে গল্প করিয়া আমার অনেকটা ভ্রমণের কাজ হইত । দুইধারে বন্ধুর দুর্গম দগ্ধ রক্তবর্ণ উচ্চ গিরিশ্রেণী , মধ্যে সংকীর্ণ মরুপথ , বোঝাই-করা উষ্ট্রের শ্রেণী চলিয়াছে ; পাগড়িপরা বণিক ও পথিকেরা কেহ-বা উটের ' পরে , কেহ-বা পদব্রজে; কাহারো হাতে বর্শা , কাহারো হাতে সেকেলে চক্ মকি-ঠোকা বন্দুক — কাবুলি মেঘমন্দ্রস্বরে ভাঙা বাংলায় স্বদেশের গল্প করিত আর এই ছবি আমার চোখের সম্মুখ দিয়া চলিয়া যাইত ।

মিনির মা অত্যন্ত শঙ্কিত স্বভাবের লোক; রাস্তায় একটা শব্দ শুনিলেই তাঁহার মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত মাতাল আমাদের বাড়িটাই বিশেষ লক্ষ্য করিয়া ছুটিয়া আসিতেছে । এই পৃথিবীটা যে সর্বত্রই চোর ডাকাত মাতাল সাপ বাঘ ম্যালেরিয়া শুঁয়াপোকা আরসোলা এবং গোরার দ্বারা পরিপূর্ণ এতদিন (খুব বেশি দিন নহে) পৃথিবীতে বাস করিয়াও সে বিভীষিকা তাঁহার মন হইতে দূর হইয়া যায় নাই ।

রহমত কাবুলিওয়ালা সম্বন্ধে তিনি সম্পূর্ণ নিঃসংশয় ছিলেন না । তাহার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখিবার জন্য তিনি আমাকে বারবার অনুরোধ করিয়াছিলেন । আমি তাঁহার সন্দেহ হাসিয়া উড়াইয়া দিবার চেষ্টা করিলে তিনি পর্যায়ক্রমে আমাকে গুটিকতক প্রশ্ন করিলেন , “ কখনো কি কাহারো ছেলে চুরি যায় না । কাবুলদেশে কি দাস-ব্যাবসা প্রচলিত নাই । একজন প্রকাণ্ড কাবুলির পক্ষে একটি ছোটো ছেলে চুরি করিয়া লইয়া যাওয়া একেবারেই কি অসম্ভব । ”

আমাকে মানিতে হইল , ব্যাপারটা যে অসম্ভব তাহা নহে, কিন্তু অবিশ্বাস্য । বিশ্বাস করিবার শক্তি সকলের সমান নহে , এইজন্য আমার স্ত্রীর মনে ভয় রহিয়া গেল । কিন্তু তাই বলিয়া বিনা দোষে রহমতকে আমাদের বাড়িতে আসিতে নিষেধ করিতে পারিলাম না ।



প্রতি বৎসর মাঘ মাসের মাঝামাঝি রহমত দেশে চলিয়া যায় । এই সময়টা সমস্ত পাওনার টাকা আদায় করিবার জন্য সে বড়ো ব্যস্ত থাকে । বাড়ি বাড়ি ফিরিতে হয়, কিন্তু তবু একবার মিনিকে দর্শন দিয়া যায় । দেখিলে বাস্তবিক মনে হয় , উভয়ের মধ্যে যেন একটা ষড়যন্ত্র চলিতেছে । সকালে যেদিন আসিতে পারে না সেদিন দেখি সন্ধ্যার সময় আসিয়াছে। অন্ধকারে ঘরের কোণে সেই ঢিলেঢালা-জামা-পায়জামা পরা সেই ঝোলাঝুলিওয়ালা লম্বা লোকটাকে দেখিলে বাস্তবিক হঠাৎ মনের ভিতরে একটা আশঙ্কা উপস্থিত হয় । কিন্তু, যখন দেখি মিনি ‘ কাবুলিওয়ালা , ও কাবুলিওয়ালা ' করিয়া হাসিতে হাসিতে ছুটিয়া আসে এবং দুই অসমবয়সী বন্ধুর মধ্যে পুরাতন সরল পরিহাস চলিতে থাকে তখন সমস্ত হৃদয় প্রসন্ন হইয়া উঠে । একদিন সকালে আমার ছোটো ঘরে বসিয়া প্রুফশীট সংশোধন করিতেছি । বিদায় লইবার পূর্বে আজ দিন-দুইতিন হইতে শীতটা খুব কন্‌কনে হইয়া উঠিয়াছে , চারি দিকে একেবারে হীহীকার পড়িয়া গেছে । জানালা ভেদ করিয়া সকালের রৌদ্রটি টেবিলের নীচে আমার পায়ের উপর আসিয়া পড়িয়াছে , সেই উত্তাপটুকু বেশ মধুর বোধ হইতেছে; বেলা বোধ করি আটটা হইবে, মাথায়-গলাবন্ধ-জড়ানো উষাচরগণ প্রাতর্ভ্রমণ সমাধা করিয়া প্রায় সকলে ঘরে ফিরিয়া আসিয়াছে । এমন সময় রাস্তায় ভারি একটা গোল শুনা গেল ।

চাহিয়া দেখি , আমাদের রহমতকে দুইপাহারাওয়ালা বাঁধিয়া লইয়া আসিতেছে — তাহার পশ্চাতে কৌতূহলী ছেলের দল চলিয়াছে । রহমতের গাত্রবস্ত্রে রক্তচিহ্ন এবং একজন পাহারাওয়ালার হাতে রক্তাক্ত ছোরা । আমি দ্বারের বাহিরে গিয়া পাহারাওয়ালাকে দাঁড় করাইলাম; জিজ্ঞাসা করিলাম , ব্যাপারটা কী ।

কিয়দংশ তাহার কাছে কিয়দংশ রহমতের কাছে শুনিয়া জানিলাম যে , আমাদের প্রতিবেশী একজন লোক রামপুরী চাদরের জন্য রহমতের কাছে কিঞ্চিৎ ধারিত — মিথ্যাপূর্বক সেই দেনা সে অস্বীকার করে এবং তাহাই লইয়া বচসা করিতে করিতে রহমত তাহাকে এক ছুরি বসাইয়া দিয়াছে ।

রহমত সেই মিথ্যাবাদীর উদ্দেশে নানারূপ অশ্রাব্য গালি দিতেছে , এমন সময় ‘ কাবুলিওয়ালা , ও কাবুলিওয়ালা ' করিয়া ডাকিতে ডাকিতে মিনি ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিল ।

রহমতের মুখ মুহূর্তের মধ্যে কৌতুকহাস্যে প্রফুল্ল হইয়া উঠিল । তাহার স্কন্ধে আজ ঝুলি ছিল না , সুতরাং ঝুলি সম্বন্ধে তাহাদের অভ্যস্ত আলোচনা হইতে পারিল না । মিনি একেবারেই তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল , “ তুমি শ্বশুরবাড়ি যাবে ? ”

রহমত হাসিয়া কহিল , “ সিখানেই যাচ্ছে । ”

দেখিল উত্তরটা মিনির হাস্যজনক হইল না , তখন হাত দেখাইয়া বলিল , “ সসুরাকে মারিতাম, কিন্তু কী করিব , হাত বাঁধা । ”

সাংঘাতিক আঘাত করা অপরাধে কয়েক বৎসর রহমতের কারাদণ্ড হইল ।

তাহার কথা একপ্রকার ভুলিয়া গেলাম । আমরা যখন ঘরে বসিয়া চিরাভ্যস্তমত নিত্য কাজের মধ্যে দিনের পর দিন কাটাইতাম তখন একজন স্বাধীন পর্বতচারী পুরুষ কারাপ্রাচীরের মধ্যে যে কেমন করিয়া বর্ষযাপন করিতেছে , তাহা আমাদের মনেও উদয় হইত না ।

আর , চঞ্চলহৃদয়া মিনির আচরণ যে অত্যন্ত লজ্জাজনক তাহা তাহার বাপকেও স্বীকার করিতে হয় । সে স্বচ্ছন্দে তাহার পুরাতন বন্ধুকে বিস্মৃত হইয়া প্রথমে নবী সহিসের সহিত সখ্য স্থাপন করিল । পরে ক্রমে যত তাহার বয়স বাড়িয়া উঠিতে লাগিল ততই সখার পরিবর্তে একটি একটি করিয়া সখী জুটিতে লাগিত । এমন-কি , এখন তাহার বাবার লিখিবার ঘরেও তাহাকে আর দেখিতে পাওয়া যায় না । আমি তো তাহার সহিত একপ্রকার আড়ি করিয়াছি ।



কত বৎসর কাটিয়া গেল । আর-একটি শরৎকাল আসিয়াছে । আমার মিনির বিবাহের সম্বন্ধ স্থির হইয়াছে । পূজার ছুটির মধ্যে তাহার বিবাহ হইবে । কৈলাসবাসিনীর সঙ্গে সঙ্গে আমার ঘরের আনন্দময়ী পিতৃভবন অন্ধকার করিয়া পতিগৃহে যাত্রা করিবে ।

প্রভাতটি অতি সুন্দর হইয়া উদয় হইয়াছে । বর্ষার পরে এই শরতের নূতনধৌত রৌদ্র যেন সোহাগায়-গলানো নির্মল সোনার মতো রঙ ধরিয়াছে । কলিকাতার গলির ভিতরকার ইষ্টকজর্জর অপরিচ্ছন্ন ঘেঁষাঘেঁষি বাড়িগুলির উপরেও এই রৌদ্রের আভা একটি অপরূপ লাবণ্য বিস্তার করিয়াছে । আমার ঘরে আজ রাত্রি শেষ হইতে না হইতে সানাই বাজিতেছে । সে বাঁশি যেন আমার বুকের পঞ্জরের হাড়ের মধ্য হইতে কাঁদিয়া কাঁদিয়া বাজিয়া উঠিতেছে । করুণ ভৈরবী রাগিণীতে আমার আসন্ন বিচ্ছেদব্যথাকে শরতের রৌদ্রের সহিত সমস্ত বিশ্বজগৎময় ব্যাপ্ত করিয়া দিতেছে । আজ আমার মিনির বিবাহ ।

সকাল হইতে ভারি গোলমাল , লোকজনের আনাগোনা । উঠানে বাঁশ বাঁধিয়া পাল খাটানো হইতেছে ; বাড়ির ঘরে ঘরে এবং বারান্দায় ঝাড় টাঙাইবার ঠুংঠাং শব্দ উঠিতেছে ; হাঁকডাকের সীমা নাই ।

আমি আমার লিখিবার ঘরে বসিয়া হিসাব দেখিতেছি , এমন সময় রহমত আসিয়া সেলাম করিয়া দাঁড়াইল ।

আমি প্রথমে তাহাকে চিনিতে পারিলাম না । তাহার সে ঝুলি নাই, তাহার সে লম্বা চুল নাই , তাহার শরীরে পূর্বের মতো সে তেজ নাই । অবশেষে তাহার হাসি দেখিয়া তাহাকে চিনিলাম ।

কহিলাম , “ কী রে রহমত , কবে আসিলি? ”

সে কহিল , “ কাল সন্ধ্যাবেলা জেল হইতে খালাস পাইয়াছি । ”

কথাটা শুনিয়া কেমন কানে খট করিয়া উঠিল । কোনো খুনীকে কখনো প্রত্যক্ষ দেখি নাই , ইহাকে দেখিয়া সমস্ত অন্তঃকরণ যেন সংকুচিত হইয়া গেল । আমার ইচ্ছা করিতে লাগিল , আজিকার এই শুভদিনে এ লোকটা এখান হইতে গেলেই ভালো হয় ।

আমি তাহাকে কহিলাম , “ আজ আমাদের বাড়িতে একটা কাজ আছে , আমি কিছু ব্যস্ত আছি , তুমি আজ যাও । ”

কথাটা শুনিয়াই সে তৎক্ষণাৎ চলিয়া যাইতে উদ্যত হইল , অবশেষে দরজার কাছে গিয়া একটু ইতস্তত করিয়া কহিল , “ খোঁখীকে একবার দেখিতে পাইব না ? ”

তাহার মনে বুঝি বিশ্বাস ছিল , মিনি সেই ভাবেই আছে । সে যেন মনে করিয়াছিল , মিনি আবার সেই পূর্বের মতো ‘ কাবুলিওয়ালা , ও কাবুলিওয়ালা ' করিয়া ছুটিয়া আসিবে , তাহাদের সেই অত্যন্ত কৌতুকাবহ পুরাতন হাস্যালাপের কোনোরূপ ব্যত্যয় হইবে না । এমন-কি , পূর্ববন্ধুত্ব স্মরণ করিয়া সে একবাক্স আঙুর এবং কাগজের মোড়কে কিঞ্চিৎ কিস্‌মিস্ বাদাম বোধ করি কোনো স্বদেশীয় বন্ধুর নিকট হইতে চাহিয়া-চিন্তিয়া সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিল — তাহার সে নিজের ঝুলিটি আর ছিল না ।

আমি কহিলাম , “ আজ বাড়িতে কাজ আছে , আজ আর কাহারো সহিত দেখা হইতে পারিবে না । ”

সে যেন কিছু ক্ষুণ্ন হইল । স্তব্ধভাবে দাঁড়াইয়া একবার স্থির দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে চাহিল , তার পরে ‘ বাবু সেলাম ' বলিয়া দ্বারের বাহির হইয়া গেল ।

আমার মনে কেমন একটু ব্যথা বোধ হইল । মনে করিতেছি তাহাকে ফিরিয়া ডাকিব , এমন সময়ে দেখি সে আপনি ফিরিয়া আসিতেছে ।

কাছে আসিয়া কহিল , “ এই আঙুর এবং কিঞ্চিৎ কিস্‌মিস বাদাম খোঁখীর জন্য আনিয়াছিলাম , তাহাকে দিবেন । ”

আমি সেগুলি লইয়া দাম দিতে উদ্যত হইলে সে হঠাৎ আমার হাত চাপিয়া ধরিল; কহিল , “ আপনার বহুৎ দয়া , আমার চিরকাল স্মরণ থাকিবে — আমাকে পয়সা দিবেন না ।

"বাবু , তোমার যেমন একটি লড়কী আছে , তেমনি দেশে আমারও একটি লড়কী আছে । আমি তাহারই মুখখানি স্মরণ করিয়া তোমার খোঁখীর জন্য কিছু কিছু মেওয়া হাতে লইয়া আসি , আমি তো সওদা করিতে আসি না । ”

এই বলিয়া সে আপনার মস্ত ঢিলা জামাটার ভিতর হাত চালাইয়া দিয়া বুকের কাছে কোথা হইতে একটুকরা ময়লা কাগজ বাহির করিল । বহু সযত্নে ভাঁজ খুলিয়া দুই হস্তে আমার টেবিলের উপর মেলিয়া ধরিল । দেখিলাম , কাগজের উপর একটি ছোটো হাতের ছাপ । ফোটোগ্রাফ নহে , তেলের ছবি নহে , হাতে খানিকটা ভুসা মাখাইয়া কাগজের উপরে তাহার চিহ্ন ধরিয়া লইয়াছে । কন্যার এই স্মরণচিহ্নটুকু বুকের কাছে লইয়া রহমত প্রতিবৎসর কলিকাতার রাস্তায় মেওয়া বেচিতে আসে — যেন সেই সুকোমল ক্ষুদ্র শিশুহস্তটুকুর স্পর্শখানি তাহার বিরাট বিরহী বক্ষের মধ্যে সুধাসঞ্চয় করিয়া রাখে ।

দেখিয়া আমার চোখ ছল্‌ছল্‌ করিয়া আসিল । তখন , সে যে একজন কাবুলি মেওয়াওয়ালা আর আমি যে একজন বাঙালি সম্ভ্রান্তবংশীয় , তাহা ভুলিয়া গেলাম – তখন বুঝিতে পারিলাম , সেও যে আমিও সে , সেও পিতা আমিও পিতা । তাহার পর্বতগৃহবাসিনী ক্ষুদ্র পার্বতীর সেই হস্তচিহ্ন আমারই মিনিকে স্মরণ করাইয়া দিল । আমি তৎক্ষণাৎ তাহাকে অন্তঃপুর হইতে ডাকাইয়া পাঠাইলাম । অন্তঃপুরে ইহাতে অনেক আপত্তি উঠিয়াছিল । কিন্তু, আমি কিছুতে কর্ণপাত করিলাম না । রাঙা-চেলি-পরা কপালে-চন্দন-আঁকা বধূবেশিনী মিনি সলজ্জ ভাবে আমার কাছে আসিয়া দাঁড়াইল ।

তাহাকে দেখিয়া কাবুলিওয়ালা প্রথমটা থতমত খাইয়া গেল , তাহাদের পুরাতন আলাপ জমাইতে পারিল না । অবশেষে হাসিয়া কহিল , “ খোঁখী , তোমি সসুরবাড়ি যাবিস্ ? ”

মিনি এখন শ্বশুরবাড়ির অর্থ বোঝে , এখন আর সে পূর্বের মতো উত্তর দিতে পারিল না, রহমতের প্রশ্ন শুনিয়া লজ্জায় আরক্ত হইয়া মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইল । কাবুলিওয়ালার সহিত মিনির যেদিন প্রথম সাক্ষাৎ হইয়াছিল , আমার সেই দিনের কথা মনে পড়িল । মনটা কেমন ব্যথিত হইয়া উঠিল ।

মিনি চলিয়া গেলে একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া রহমত মাটিতে বসিয়া পড়িল । সে হঠাৎ স্পষ্ট বুঝিতে পারিল , তাহার মেয়েটিও ইতিমধ্যে এইরূপ বড়ো হইয়াছে , তাহার সঙ্গেও আবার নূতন আলাপ করিতে হইবে — তাহাকে ঠিক পূর্বের মতো তেমনটি আর পাইবে না । এ আট বৎসরে তাহার কী হইয়াছে তাই বা কে জানে । সকালবেলায় শরতের স্নিগ্ধ রৌদ্রকিরণের মধ্যে সানাই বাজিতে লাগিল , রহমত কলিকাতার এক গলির ভিতরে বসিয়া আফগানিস্থানের এক মরু পর্বতের দৃশ্য দেখিতে লাগিল ।

আমি একখানি নোট লইয়া তাহাকে দিলাম । বলিলাম , “ রহমত , তুমি দেশে তোমার মেয়ের কাছে ফিরিয়া যাও ; তোমাদের মিলনসুখে আমার মিনির কল্যাণ হউক । ”

এই টাকাটা দান করিয়া হিসাব হইতে উৎসব-সমারোহের দুটো-একটা অঙ্গ ছাঁটিয়া দিতে হইল । যেমন মনে করিয়াছিলাম তেমন করিয়া ইলেকট্রিক আলো জ্বালাইতে পারিলাম না , গড়ের বাদ্যও আসিল না , অন্তঃপুরে মেয়েরা অত্যন্ত অসন্তোষ প্রকাশ করিতে লাগিলেন , কিন্তু মঙ্গল-আলোকে আমার শুভ উৎসব উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। 

বলাই - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মানুষের জীবনটা পৃথিবীর নানা জীবের ইতিহাসের
নানা পরিচ্ছেদের উপসংহারে, এমন
একটা কথা আছে। লোকালয়ে মানুষের
মধ্যে আমরা নানা জীবজন্তুর প্রচ্ছন্ন পরিচয়
পেয়ে থাকি, সে কথা জানা। বস্তুত আমরা মানুষ
বলি সেই পদার্থকে যেটা আমাদের ভিতরকার সব
জীবজন্তুকে মিলিয়ে এক ক’রে নিয়েছে—
আমাদের বাঘ-গোরুকে এক
খোঁয়াড়ে দিয়েছে পুরে অহি-নকুলকে এক খাঁচায়
ধ’রে রেখেছে। যেমন রাগিনী বলি তাকেই
যা আপনার ভিতরকার সমুদয় সা-রে-গা-মা-
গুলোকে সংগীত করে তোলে, তার পর
থেকে তাদের আর গোলমাল করবার সাধ্য
থাকে না। কিন্তু, সংগীতের ভিতরে এক-একটি সুর
অন্য-সকল সুরকে ছাড়িয়ে বিশেষ হয়ে ওঠে—
কোনোটাতে মধ্যম,
কোনোটাতে কোমলগান্ধার,
কোনোটাতে পঞ্চম।
আমার ভাইপো বলাই— তার প্রকৃতিতে কেমন
করে গাছপালার মূল সুরগুলোই হয়েছে প্রবল।
ছেলেবেলা থেকেই চুপচাপ চেয়ে চেয়ে দেখাই তার
অভ্যাস, নড়ে-চড়ে বেড়ানো নয়। পুবদিকের
আকাশে কালো মেঘ স্তরে স্তরে স্তম্ভিত
হয়ে দাঁড়ায়, ওর সমস্ত
মনটাতে ভিজে হাওয়া যেন শ্রাবণ-অরণ্যের গন্ধ
নিয়ে ঘনিয়ে ওঠে; ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ে, ওর
সমস্ত গা যেন শুনতে পায় সেই বৃষ্টির শব্দ।
ছাদের উপর বিকেল বেলাকার রোদ্দুর
পড়ে আসে, গা খুলে বেড়ায়; সমস্ত আকাশ
থেকে যেন কী একটা সংগ্রহ ক’রে নেয়। মাঘের
শেষে আমের বোল ধরে, তার একটা নিবিড়
আনন্দ জেগে ওঠে ওর রক্তের মধ্যে,
একটা কিসের অব্যক্ত স্মৃতিতে;
ফাল্গুনে পুষ্পিত শালবনের মতোই ওর অন্তর-
প্রকৃতিটা চার দিকে বিস্তৃত হয়ে ওঠে,
ভরে ওঠে তাতে একটা ঘন রঙ লাগে। তখন ওর
একলা বসে বসে আপন
মনে কথা কইতে ইচ্ছে করে, যা-কিছু গল্প
শুনেছে সব নিয়ে জোড়াতাড়া দিয়ে।
অতি পুরানো বটের
কোটরে বাসা বেঁধে আছে যে একজোড়া অতি পুরানো পাখি,
বেঙ্গমা-বেঙ্গমী, তাদের গল্প। ওই ড্যাবা-
ড্যাবা-চোখ-মেলে-সর্বদা-তাকিয়ে-
থাকা ছেলেটা বেশি কথা কইতে পারে না। তাই
ওকে মনে মনে অনেক বেশি ভাবতে হয়।
ওকে একবার পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছিলুম। আমাদের
বাড়ির সামনে ঘন সবুজ ঘাস পাহাড়ের ঢাল
বেয়ে নিচে পর্যন্ত নেবে গিয়েছে,
সেইটে দেখে আর ওর মন ভারি খুশি হয়ে ওঠে।
ঘাসের আস্তরণটা একটা স্থির পদার্থ তা ওর
মনে হয় না; ওর বোধ হয়, যেন ওই ঘাসের পুঞ্জ
একটা গড়িয়ে-চলা খেলা, কেবলই গড়াচ্ছে; প্রায়ই
তারই সেই ঢালু বেয়ে ও নিজেও গড়াত— সমস্ত
দেহ দিয়ে ঘাস হয়ে উঠত—
গড়াতে গড়াতে ঘাসের আগায় ওর ঘাড়ের
কাছে সুড়্সুড়ি লাগত আর ও খিল্ খিল্
ক’রে হেসে উঠত।
রাত্রে বৃষ্টির পরে প্রথম সকালে সামনের
পাহাড়ের শিখর দিয়ে কাঁচা সোনারঙের রোদ্দুর
দেবদারুবনের উপরে এসে পড়ে— ও
কাউকে না ব’লে আস্তে আস্তে গিয়ে সেই
দেবদারুবনের নিস্তব্ধ ছায়াতলে একলা অবাক
হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, গা ছম্ছম্ করে— এই সব
প্রকাণ্ড গাছের ভিতরকার মানুষ কে ও যেন
দেখতে পায়। তারা কথা কয় না, কিন্তু সমস্তই
যেন জানে। তারা-সব যেন অনেক কালের
দাদামশায়, ‘এক যে ছিল রাজা’দের আমলের।
ওর ভাবে-ভোলা চোখটা কেবল যে উপরের
দিকেই তা নয়, অনেক সময় দেখেছি, ও আমার
বাগানে বেড়াচ্ছে মাটির দিকে কী খুঁজে খুঁজে।
নতুন অঙ্কুরগুলো তাদের কোঁকড়ানো মাথাটুকু
নিয়ে আলোতে ফুটে উঠছে এই দেখতে তার
ঔৎসুক্যের সীমা নেই। প্রতিদিন
ঝুঁকে পড়ে পড়ে তাদেরকে যেন জিজ্ঞাসা করে,
‘তার পরে? তার পরে? তার পরে?’ তারা ওর চির-
অসমাপ্ত গল্প। সদ্য-গজিয়ে-
ওঠা কচি কচি পাতা, তাদের সঙ্গে ওর কী-
যে একটা বয়স্যভাব তা ও কেমন করে প্রকাশ
করবে। তারাও ওকে কী-একটা প্রশ্ন
জিজ্ঞাসা করবার জন্য আঁকুপাঁকু করে।
হয়তো বলে, ‘তোমার নাম কী’। হয়তো বলে,
‘তোমার মা কোথায় গেল।’ বলাই
মনে মনে উত্তর করে, ‘আমার মা তো নেই।’
কেউ গাছের ফুল তোলে এইটে ওর বড়ো বাজে।
আর-কারও কাছে ওর এই সংকোচের
কোনো মানে নেই, এটাও সে বুঝেছে।
এইজন্যে ব্যথাটা লুকোতে চেষ্টা করে। ওর
বয়সের ছেলেগুলো গাছে ঢিল
মেরে মেরে আমলকি পাড়ে, ও কিছু
বলতে পারে না, সেখান থেকে মুখ
ফিরিয়ে চ’লে যায়। ওর সঙ্গীরা ওকে খ্যাপাবার
জন্যে বাগানের ভিতর
দিয়ে চলতে চলতে ছড়ি দিয়ে দু পাশের
গাছগুলোকে মারতে মারতে চলে, ফস্
ক’রে বকুলগাছের একটা ডাল ভেঙে নেয়— ওর
কাঁদতে লজ্জা করে পাছে সেটাকে কেউ
পাগলামি মনে করে। ওর সব চেয়ে বিপদের দিন,
যেদিন ঘাসিয়াড়া ঘাস কাটতে আসে। কেননা,
ঘাসের ভিতরে ভিতরে ও প্রত্যহ
দেখে দেখে বেড়িয়েছে; এতটুকু-টুকু লতা,
বেগনি হল্দে নামহারা ফুল,
অতি ছোটো ছোটো;
মাঝে মাঝে কন্টিকারি গাছ, তার নীল নীল
ফুলের বুকের মাঝখানটিতে ছোট্ট
একটুখানি সোনার ফোঁটা; বেড়ার
কাছে কাছে কোথাও-বা কালমেঘের লতা,
কোথাও বা অনন্তমূল; পাখিতে-খাওয়া নিমফলের
বিচি প’ড়ে ছোটো ছোটো চারা বেরিয়েছে,
কী সুন্দর তার পাতা— সমস্তই নিষ্ঠুর
নিড়নি দিয়ে দিয়ে নিড়িয়ে ফেলা হয়।
তারা বাগানের শৌখিন গাছ নয়, তাদের নালিশ
শোনবার কেউ নেই।
এক-একদিন ওর কাকির কোলে এসে ব’সে তার
গলা জড়িয়ে বলে, “ওই ঘাসিয়াড়াকে বলো-না,
আমার ওই গাছগুলো যেন না কাটে।”
কাকি বলে, “বলাই, কী যে পাগলের মতো বকিস।
ও যে সব জঙ্গল, সাফ না করলে চলবে কেন।”
বলাই অনেকদিন থেকে বুঝতে পেরেছিল,
কতকগুলো ব্যথা আছে যা সম্পূর্ণ ওর একলারই
— ওর চারি দিকের লোকের মধ্যে তার
কোনো সাড়া নেই।
এই ছেলের আসল বয়স সেই কোটি বৎসর
আগেকার দিনে যেদিন সমুদ্রের গর্ভ থেকে নতুন-
জাগা পঙ্কস্তরের মধ্যে পৃথিবীর ভাবী অরণ্য
আপনার জন্মের প্রথম ক্রন্দন উঠিয়েছে—
সেদিন পশু নেই, পাখি নেই, জীবনের কলরব নেই,
চার দিকে পাথর আর পাঁক আর জল। কালের
পথে সমস্ত জীবের অগ্রগামী গাছ, সূর্যের
দিকে জোড় হাত তুলে বলেছে, ‘আমি থাকব,
আমি বাঁচব, আমি চিরপথিক, মৃত্যুর পর মৃত্যুর
মধ্য দিয়ে অন্তহীন প্রাণের
বিকাশতীর্থে যাত্রা করব রৌদ্রে-বাদলে, দিনে-
রাত্রে।’ গাছের সেই রব আজও উঠছে বনে বনে,
পর্বতে প্রান্তরে; তাদেরই শাখায় পত্রে ধরণীর
প্রাণ বলে বলে উঠছে, ‘আমি থাকব,
আমি থাকব।’ বিশ্বপ্রাণের মূক ধাত্রী এই গাছ
নিরবচ্ছিন্ন কাল ধ’রে দ্যুলোককে দোহন করে;
পৃথিবীর অমৃতভাণ্ডারের জন্যে প্রাণের তেজ,
প্রাণের রস, প্রাণের লাবণ্য সঞ্চয় করে; আর
উৎকণ্ঠিত প্রাণের
বাণীকে অহর্নিশি আকাশে উচ্ছ্বসিত
ক’রে তোলে, ‘আমি থাকব।’ সেই বিশ্বপ্রাণের
বাণী কেমন-এক-রকম ক’রে আপনার রক্তের
মধ্যে শুনতে পেয়েছিল ওই বলাই। আমরা তাই
নিয়ে খুব হেসেছিলুম।
একদিন সকালে একমনে খবরের কাগজ পড়ছি,
বলাই আমাকে ব্যস্ত করে ধরে নিয়ে গেল
বাগানে। এক জায়গায়
একটা চারা দেখিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলে,
“কাকা, এ গাছটা কী।”
দেখলুম একটা শিমুলগাছের চারা বাগানের
খোওয়া-দেওয়া রাস্তার মাঝখানেই উঠেছে।
হায় রে, বলাই ভুল করেছিল
আমাকে ডেকে নিয়ে এসে। এতটুকু যখন এর
অঙ্কুর বেরিয়েছিল, শিশুর প্রথম প্রলাপটুকুর
মতো, তখনই এটা বলাইয়ের চোখে পড়েছে।
তার পর থেকে বলাই প্রতিদিন নিজের
হাতে একটু একটু জল দিয়েছে,
সকালে বিকেলে ক্রমাগত ব্যগ্র
হয়ে দেখেছে কতটুকু বাড়ল। শিমুলগাছ বাড়েও
দ্রুত, কিন্তু বলাইয়ের আগ্রহের
সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না। যখন হাত দুয়েক
উঁচু হয়েছে তখন ওর পত্রসমৃদ্ধি দেখে ভাবলে এ
একটা আশ্চর্য গাছ, শিশুর প্রথম বুদ্ধির আভাস
দেখবামাত্র মা যেমন মনে করে আশ্চর্য শিশু।
বলাই ভাবলে, আমাকেও চমৎকৃত ক’রে দেবে।
আমি বললুম, “মালীকে বলতে হবে,
এটা উপড়ে ফেলে দেবে।”
বলাই চমকে উঠল। এ কী দারুণ কথা। বললে,
“না, কাকা, তোমার দুটি পায়ে পড়ি,
উপড়ে ফেলো না।”
আমি বললুম, “কী যে বলিস তার ঠিক নেই।
একেবারে রাস্তার মাঝখানে উঠেছে।
বড়ো হলে চার দিকে তুলো ছড়িয়ে অস্থির
ক’রে দেবে।”
আমার সঙ্গে যখন পারলে না, এই মাতৃহীন
শিশুটি গেল তার কাকির কাছে।
কোলে ব’সে তার
গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললে,
“কাকি, তুমি কাকাকে বারণ ক’রে দাও,
গাছটা যেন না কাটেন।”
উপায়টা ঠিক ঠাওরেছিল। ওর
কাকি আমাকে ডেকে বললে, “ওগো, শুনছ!আহা,
ওর গাছটা রেখে দাও।”
রেখে দিলুম। গোড়ায় বলাই না যদি দেখাত
তবে হয়তো ওটা আমার লক্ষ্যই হত না। কিন্তু
এখন রোজই চোখে পড়ে। বছরখানেকের
মধ্যে গাছটা নির্লজ্জের মতো মস্ত
বেড়ে উঠল। বলাইয়ের এমন হল, এই গাছটার
’পরেই তার সব চেয়ে স্নেহ।
গাছটাকে প্রতিদিনই দেখাচ্ছে নিতান্ত
নির্বোধের মতো। একটা অজায়গায়
এসে দাঁড়িয়ে কাউকে খাতির নেই,
একেবারে খাড়া লম্বা হয়ে উঠছে। যে দেখে সেই
ভাবে, এটা এখানে কী করতে। আরও দু-চারবার
এর মৃত্যুদণ্ডের প্রস্তাব করা গেল।
বলাইকে লোভ দেখালুম, এর বদলে খুব
ভালো কতকগুলো গোলাপের চারা আনিয়ে দেব।
বললেম, “নিতান্তই শিমুলগাছই যদি তোমার
পছন্দ, তবে আর-একটা চারা আনিয়ে বেড়ার
ধারে পুঁতে দেব, সুন্দর দেখতে হবে।”
কিন্তু কাটবার কথা বললেই আঁতকে ওঠে, আর
ওর কাকি বলে, “আহা, এমনিই কী খারাপ
দেখতে হয়েছে।”
আমার বউদিদির মৃত্যু হয়েছে যখন এই
ছেলেটি তাঁর কোলে। বোধ করি সেই
শোকে দাদার খেয়াল গেল,
তিনি বিলেতে এঞ্জিনিয়ারিং শিখতে গেলেন।
ছেলেটি আমার নিঃসন্তান ঘরে কাকির কোলেই
মানুষ। বছর দশেক
পরে দাদা ফিরে এসে বলাইকে বিলাতি কায়দায়
শিক্ষা দেবেন ব’লে প্রথমে নিয়ে গেলেন সিমলেয়
— তার পরে বিলেতে নিয়ে যাবার কথা।
কাঁদতে কাঁদতে কাকির কোল ছেড়ে বলাই
চলে গেল, আমাদের ঘর হল শূন্য।
তার পরে দু বছর যায়। ইতিমধ্যে বলাইয়ের
কাকি গোপনে চোখের জল মোছেন, আর
বলাইয়ের শূন্য শোবার ঘরে গিয়ে তার
ছেঁড়া এক-পাটি জুতো, তার রবারের
ফাটা গোলা, আর জানোয়ারের গল্পওয়ালা ছবির
বই নাড়েন-চাড়েন; এতদিনে এই-সব
চিহ্নকে ছাড়িয়ে গিয়ে বলাই অনেক
বড়ো হয়ে উঠেছে, এই
কথা বসে বসে চিন্তা করেন।
কোনো-এক সময়ে দেখলুম,
লক্ষ্মীছাড়া শিমুলগাছটার বড়ো বাড় বেড়েছে—
এতদূর অসংগত হয়ে উঠেছে যে আর প্রশ্রয়
দেওয়া চলে না। এক সময়ে দিলুম তাকে কেটে।
এমন সময়ে সিমলে থেকে বলাই তার কাকিকে এক
চিঠি পাঠালে, “কাকি, আমার সেই শিমুলগাছের
একটা ফোটোগ্রাফ পাঠিয়ে দাও।”
বিলেত যাবার পূর্বে একবার আমাদের
কাছে আসবার কথা ছিল, সে আর হল না। তাই
বলাই তার বন্ধুর ছবি নিয়ে যেতে চাইলে।
তার কাকি আমাকে ডেকে বললেন, “ওগো শুনছ,
একজন ফোটোগ্রাফওয়ালা ডেকে আনো।”
জিজ্ঞাসা করলুম, “কেন।”
বলাইয়ের কাঁচা হাতের
লেখা চিঠি আমাকে দেখতে দিলেন।
আমি বললেম, “সে গাছ তো কাটা হয়ে গেছে।”
বলাইয়ের কাকি দুদিন অন্ন গ্রহণ করলেন না,
আর অনেকদিন পর্যন্ত আমার
সঙ্গে একটি কথাও কন নি। বলাইয়ের
বাবা ওকে তাঁর কোল থেকে নিয়ে গেল, সে যেন
ওঁর নাড়ী ছিঁড়ে; আর ওর কাকা তাঁর বলাইয়ের
ভালোবাসার গাছটিকে চিরকালের
মতো সরিয়ে দিলে, তাতেও ওঁর যেন সমস্ত
সংসারকে বাজল, তাঁর বুকের মধ্যে ক্ষত
ক’রে দিলে।
ঐ গাছ যে ছিল তাঁর বলাইয়ের প্রতিরূপ, তারই
প্রাণের দোসর।
(সমাপ্ত)